প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সরকারের ভুল নীতি, অপর্যাপ্ত প্রণোদনা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাবের কারণে দেশের টেক্সটাইল শিল্প, বিশেষত স্পিনিং খাত চরম সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাকি কারখানাগুলোও মাত্র ৪০ ভাগ ক্যাপাসিটিতে চলছে।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে স্পিনিং শিল্প রক্ষার দাবিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অবিলম্বে আশু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
লিখিত বক্তব্যে সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার আজহার আলী সংকটের মূল কারণগুলো তুলে ধরেন:
ধারাবাহিক ঝড়: গত কয়েক বছর ধরে কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বেড়েছে।
প্রণোদনা হ্রাস: একসময় স্পিনিং মিলে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হতো, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তা কমিয়ে দেড় শতাংশে নামিয়ে এনেছে। আজহার আলী একে "এই শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক মারা" হিসেবে আখ্যা দেন।
ভারতীয় সুতার প্রভাব: প্রণোদনা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারত সুতা রপ্তানিতে ১১ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া শুরু করে। ফলে কম দামে ভারতের সুতা দেশে প্রবেশ করতে শুরু করে।
ইডিএফ সংকট: ২২ মাস যাবৎ রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সীমা কমানোয় মিলগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকুচিত হয়েছে।
প্রণোদনা পেতে দেরি: দেশের মিল-কারখানাগুলোকে প্রণোদনার টাকা পেতে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যেখানে ভারতে তা মাত্র ৩ দিনের মধ্যে ছাড় করা হয়।
কারখানা বন্ধের আশঙ্কা: উৎপাদন খরচ অনুযায়ী সুতার দাম না পাওয়া গেলে আগামী ৬ মাস থেকে এক বছর পর বাকি মিলগুলো চালানো যাবে না।
বেঙ্গল এনএফকের পরিচালক (অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক জানান, বর্তমানে ৪০টি স্পিনিং মিল বন্ধ আছে এবং চালু মিলগুলোও ৬০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চলছে। তিনি এর জন্য বিদেশ থেকে গার্মেন্টসগুলোর সুতা আমদানিকে দায়ী করেন।
ইঞ্জিনিয়ার আজহার আলী টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি পেশ করেন:
১. নগদ প্রণোদনা: দেশি সুতা ব্যবহারে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদান। ২. জ্বালানি ছাড়: গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলে ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া। ৩. শুল্ক আরোপ: সুতা আমদানি বন্ধে অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স বা সেইফ গার্ড ডিউটি প্রয়োগ। ৪. ইডিএফ পুনর্বহাল: রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) পুনর্বহাল করা। ৫. স্থানীয় কাঁচামালের বাধ্যবাধকতা: গার্মেন্টস রপ্তানির উৎপাদন খরচের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল স্থানীয় উৎস থেকে কেনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। ৬. অতিরিক্ত প্রণোদনা: রিসাইকেল পণ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া। ৭. বিদেশি সুতা আমদানিতে শুল্ক: বিদেশি সুতা আমদানিতে সেইফগার্ড শুল্ক বসানো।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ শিল্পের ধস ঠেকানো সম্ভব হবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: ইনস্টিটিউশন অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলজিস্টসের সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার এনায়েত হোসেন বলেন, এই খাতের ওপর অন্তত ৬৩টি খাত নির্ভরশীল, তাই সমস্যা নিরসন না হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শ্রমিক ও সামাজিক অবক্ষয়: ওয়ান কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, কারখানা বন্ধ হলে মালিকরা টিকে গেলেও লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কী হবে, তা কেউ ভাবছে না। ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম বলেন, ৬ মাস বা এক বছর পর সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা যাবে না।
গার্মেন্টস শিল্পের ঝুঁকি: ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক সতর্ক করে বলেন, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প বন্ধ হলে বিদেশ থেকে ২.৫ ডলারে আমদানি করা সুতা ভবিষ্যতে ৫ ডলারে কিনতে হতে পারে।
টেক্সটাইল শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে (পোশাক শিল্পের মাধ্যমে) প্রায় ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই শিল্প শ্রমিক কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে। এই শিল্পের বর্তমান সংকট, যা ২০২৫ সালের এই সময়ে প্রকাশ পেল, তা দেশের আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্য, ডলার রিজার্ভ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বক্তাদের বক্তব্যে ভারত সরকারের নীতি সহায়তার বিপরীতে দেশীয় নীতি সহায়তার অভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রণোদনা কমানো এবং জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দেশীয় সুতা মার খাচ্ছে। সরকার যদি এখনই কার্যকর নীতি সহায়তা (যেমন: প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং সেইফগার্ড ডিউটি) না নেয়, তবে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প যে শুধু মুখ থুবড়ে পড়বে তা নয়, বরং গার্মেন্টস শিল্পকেও ভবিষ্যতের জন্য উচ্চ মূল্যে কাঁচামাল আমদানির ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।
১. ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে স্পিনিং শিল্প রক্ষার দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। ২. লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার আজহার আলী।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |